চট্টগ্রাম দেশে ভ্রমণ ভ্রমণ কাহিনী

সোনাইছড়ি ট্রেইলে ঝরণার খোঁজে

নয়ন চক্রবর্ত্তী

নতুন কিছু দেখার নেশা আর দুর্গমকে জয় করার বাসনা চিরকালই তারুণ্যের ধর্ম। ট্রেইলের হাতছানি তাই ফেরানো যায় না।

তেমনি একটি দুর্গম ট্রেইল সোনাইছড়ি। মীরসরাই এর সবচেয়ে কঠিন ট্রেইলগুলোর অন্যতম। পুরাপুরি পাথুরে এই ট্রেইলের মিল আছে বান্দরবানের তিন্দুর পাথুরে সৌন্দর্য্যের সাথে।

ধানক্ষেত ও আবাদি জমি মাড়িয়ে ট্রেইলের শুরুতেই আছে ঝরণার বারিধারা আর ছোট ছোট পাহাড়ের খাদ। ট্রেইলের শুরুটা হয় ছোট পাথর পেরিয়ে যখন পাহাড়ে উঠতে হয় তখন। গা ছমছম করা ভয় নিয়ে খাড়া উঁচু পাহাড় এর বুক বেয়ে আবার নামতে হয় সমতলে।

পাহাড়ের বুকে বেয়ে নেমে আসা জলের ঝিরি। পাহাড় ও পাথরের মাঝে খোলা আকাশের এক স্বর্গীয় স্থান।

উঁচু-নিচু পাথুরে পথ পেরিয়ে যখন গভীর কুমের মধ্যে প্রবেশ করবেন, তখনই দুর্গন্ধ।  বুঝবেন এটা ‘বাদুইজ্জ্যা কুম’। ভ্রমণ পথের মাঝামাঝি এই স্থানটি। ভূতুড়ে আবহ এবং সূর্যের আলো না পৌছানো এই স্থানটি খাড়া পাহাড়। একপাশে হাতড়েই বাদইজ্জ্যা কুমে উঠতে হয়।

কেউ যদি এই পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসতে চায় তাহলে যতটুকু দৃষ্টিনন্দন মনকাড়া দৃশ্য দেখেছেন তার চাইতে ঢের বেশি আরও অপেক্ষা করছে এরপর। অতএব ফিরবেন না, এগিয়ে যান।

এখানে মাঝেমাঝে হা করা কয়েকটা গিরিখাদ, যেন এখনই গিলে খাবে। পদে পদে এমন নানা রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছে এই ট্রেইলে।

স্থানটি পার হতে একটু ভোগান্তি পোহাতে হয়। কেননা এরপরে গভীর পাহাড়ের দুই পাশে রয়েছে খাদ। বর্ষাকালে যা মৃত্যুকূপ। শীতেও সেখানে কোমড় পানি থাকে। সেখানে কয়েকজন পার হয়েই উঁচু পাথরের খাপে পা দিয়ে পাহাড়ে লেপ্টেই পাড়ি দিতে হবে ওই পথ। এরপর ঝরণা থেকে আসা পানির মাঝে ডুবে থাকা বড় পাথরের মাঝখানে পাশ দিয়েই হাঁটতে হবে সমতল এলাকায়। সেখানে রয়েছে পাহাড়ের স্লাইড যেখানে ঝরণার বুক ফেটে বারিধারা বয়ে নামছে নানা আকার ধরে।

সমতল ঝরণার বারিধারা পেরিয়ে শুরু হয় আরেক ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেইল। যাতে থাকে আলোছায়ার খেলা। সোনাইছড়ি ট্রেইলে কখনো সূর্যের আলো দেখা মিলবে আবার কখনো অন্ধকার । তবে পথ মাড়িয়ে যখন মাঝেমধ্যে পাহাড়ের গুল্মলতা ফাঁকে আলোর রশ্মি পৌঁছায় তখন মনে হয় কোন গহীণ অরণ্যে যেন এলাম।

সেই আলো-ছায়ার দৃশ্য পেরোতেই গভীর এক খাদের দেখা মিলবে। সোনাইছড়ি ট্রেইলে প্রতিটি ধাপই এরকম এ্যাডভেঞ্চারে ভরা। তাই চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।

জোঁকের যেমন উপদ্রব থাকে, তেমনি প্রতিটি পা ফেলতে হবে সচেতনভাবে। কারণ ট্রেইল করতে যদি এক সেকেন্ড অসচেতন হয়ে যান এর ফলটা ভয়াবহ। সংর্কীণ এই ট্রেইলটি বিচিত্র সৌন্দর্য আর বিস্তৃত পাহাড়ের মেলবন্ধন তবে জনমানবহীন।

আর গ্রামবাসীরা মাঝেমধ্যে বাঁশ কাটতে বাদুরইজ্জ্যা কুম পর্যন্ত আসে। তাই পা ফেলতে হয় নিজের সুবিধা আর পাহাড়ের বুকে প্রকৃতির আকাঁ ও তৈরি করা ছোট ছোট খাপ দেখে। বিচিত্র রকমের গাছপালায় ভরপুরেএই ট্রেইলে চলার পথে পরিস্কার ঝরণার পানিতে মাঝে মাঝে শরীরটা ভিজিয়ে নেয়াট বুদ্ধিমানের কাজ।

তাহলে ক্লান্তি যেমন কমে যায়, কোন পোকা বা লতাপাতার বিষাক্ত ছোঁয়া লাগলেও রক্ষা পাওয়া যায়। খাড়া পাহাড় আন পিচ্ছিল ঝিরিপথ পেরুতে অনেক সময় সাহায্য করবে গাছের বাকল। তবে সাবধান ছোট কোন গাছের ওপর ভর করে যদি কেউ খাদ পাড় হতে যান কিংবা গভীর কোন কুম পার হতে যান তাহলে নিশ্চিত হাত-পা ভাঙ্গবে।

আর সেখানে দুর্ঘটনা মানে ৯৯৯। আর উদ্ধার করতে আসতেও সময় লাগবে ভ্রমণকারীদের। কেননা ফায়ার সার্ভিস পুলিশেরও ভ্রমণপিয়াসীদের মতো পাহাড় পেরিয়ে আসতে হবে।

তবে ট্রেইলের পুরোমাত্রায় বুনো পরিবেশের শেষ ধাপে সোনাইছড়ি ঝরণা। সরু এই ঝরণাটি সুউচ্চ। বর্ষার এই রূপ থাকে ভিন্ন সৌন্দর্য্য। তবে এই ট্রেইল শীতকালেই উপযুক্ত। বর্ষায় সোনাইছড়ি ও বাদুইজ্জ্যা খুম বিপদজনক। বৃষ্টির কারণে বড়-ছোট পাথরগুলো পিচ্ছিল থাকে।

ঝরণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেকে কয়েকটি লেয়ারে উঠতে চেষ্টা করে তবে দুটি লেয়ারের উপর না ওঠাই ভালো। বেশ নির্জন হওয়ায় পুরো ট্রেইল জুড়ে অনুভব করা যায় পাখিও বুনো বিভিন্ন প্রাণীর চলাচল।

জানিয়ে রাখা ভালো, যেপথে ট্রেইলের পথ বেয়ে পাহাড় খাদ কুম পেরিয়ে যেতে হয় সে পথে নয় বরং ফিরতে হয় পাহাড় বেয়ে। মানে ফিরতে হবে ভিন্নপথে। তাই কেউ যদি বলে ছবি না তুলে হাঁটুন দ্রুত তাহলে ভুলেও শুনবেন না। ছবি তুলেই হাঁটতে থাকুন তবে দলছুট ভাবে নয়। তবে খাড়া জায়গায় ছবি না তুলে অপেক্ষকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় তোলা ভালো। পিচ্ছিল পাহাড়ে না দাঁড়িয়ে সমতল জায়গায় এবং অন্য ভ্রমণকারীর হাঁটার গতির পথে বাঁধা না হয়ে ছবি তোলায় উত্তম।

কিভাবে যাবেন: চট্টগ্রাম থেকে যারা যাবেন তারা সীতাকুন্ড হাদি ফকিরহাট বাজারে নামতে হবে এজন্য বাসে গুনতে হবে ৫০ টাকা। সেখান থেকে হেঁটে যাওয়া যায় কিংবা সিএনজি বা রিকশায় যেতে হবে বড় পাথর নামক স্থানে । ভাড়া ২০-৩০ টাকা। এই পথটি হেঁটে যাওয়াটাই ভালো। এরপর ট্রেইল শুরু, দুই ঘন্টার কিছুটা কম ট্রেইল শেষে সোনাইছড়ি ঝরণার সাক্ষাত।

তবে দল ভারী থাকলেই সুবিধা এবং দলের সদস্যরা যদি বন্ধুসুলভ হয় তাহলে সোনাইছড়ি ট্রেইলের যাত্রা হবে মনে রাখার মতো।

কোথায় খাবেন: সোনাইছড়িতে জয়নাল উদ্দীনের বাসায় খেতে পারেন। যাওয়ার একদিন আগে জয়নাল ভাইয়ের সাথে কথা বলে খাবারের মেন্যু ও টাকা কথা বলে রাখলে সুবিধাটা ভ্রমণকারীর হবে। কারণ ট্রেইল শেষে গোসল কিংবা হাত মুখ ধোয়ার এবং প্রয়োজন হয়। এজন্য ওনার বাসায় ব্যবস্থা আছে। বলে রাখা ভালো জয়নাল ভাইয়ের বাসায় মাটি চুলায় রান্না হয়। এছাড়া রয়েছে গাইডের ব্যবস্থা। গাইড নিলে ৫০০ টাকা এবং খাবার খরচ জনপ্রতি ১৩০-১৫০ টাকা। জয়নাল উদ্দীনের নাম্বার -০১৮১৭২৫৪৫৯২

ট্রেইলে সঙ্গে যা যা নিবেন:

#হালকা ব্যাকপ্যাক

#অতিরিক্ত এক সেট পোশাক

# গ্রীপযুক্ত জুতা, যেগুলো পিচ্ছিল পথে আপনাকে রাখবে নিরাপদ। কেডস, স্যান্ডেল জুতা পড়ে ট্রেইলে যাওয়া উচিত নয়।

# গামছা, টুপি ও এক জোড়া পায়ের এ্যাংলেট ও থ্রীকোয়ার্টার প্যান্ট নিলে ভালো হয়।

# শুকনা খাবার ও পানির বোতল।

# পাহাড়ের পিচ্ছিল পথে বাঁশ হাতে হাঁটাই নিরাপদ।

## কনটেন্ট এডিটর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *