রুবী আহমেদ (ছবি -লেখক)
কাশ্মীর ঘুরে এসে
কাশ্মীর!!!! এর সৌন্দর্যের গভীরতা কোন লেখার ভাষায় ফুটিয়ে তোলা কঠিন। এই সৌন্দর্য আসলে মন থেকে অনুভব করার বিষয়। সামনে থেকে কাশ্মীরকে দেখে আপনার যে অনুভূতি হবে তা কোন লেখনি দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাই জীবনে একবারের জন্য হলেও কাশ্মীর বেড়িয়ে আসুন।
কাশ্মীর ভ্রমণে বাজেট কেমন হতে পারে? বাই এয়ারের একটা খরচের হিসাব দিতে চেষ্টা করেছি। বাকী থাকা-খাওয়া এবং ঘোরার খরচ নির্ভর করবে সময় এবং আপনার ওপর।
১. কাশ্মীর ভ্রমণের জন্য কতদিন যথেষ্ট ?
-যাদের হাতে সময় আছে তারা ৮/১০ দিনের রিলাক্স টুর করতে পারেন। তবে আমার মতে কাশ্মীর ঘোরার জন্য ৫ রাত ৬ দিন পারফেক্ট।
২. কোথায় থাকবেন?
-আগেই বলেছি প্রথম বার কাশ্মীর ভ্রমণে কোন কার্পণ্য করবেন না। এক বা দুদিন পেহেলগামে থাকবেন। এখানে আরেকটা কথা বলি পেহেলগামে আপনি যত সম্ভব শহর থেকে দূরে থাকবেন। যত দূরে আপনার হোটেল হবে তত আপনি প্রকৄতিকে কাছে পাবেন। পাশাপাশি হোটেল ভাড়াও কম হবে।
আমি ছিলাম হোটেল বৈসারন এ। হোটেলের জানালা দিয়ে তাকালেই বরফ আচ্ছাদিত বিশাল বিশাল পাহাড় মনকে বার বার খুব ইমোশনাল করে দিয়েছিল।
শ্রীনগরে হাউসবোটে অবশ্যই এক রাত থাকবেন। আমি ছিলাম নাজনীন গ্রুপ অব হাউসবোটে।
এছাড়া ডাল লেকে দুদিন ছিলাম রয়েল কমফোর্ট রিজেন্সিতে। ছিমছাম সাজানো খুব সুন্দর হোটেল। লোকেশনও খুব চমৎকার।
৩. পেহেলগামে বৈসারণ ভ্রমণ
পেহেলগামের প্রধান আকর্ষণ বৈসারণ বা মিনি সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ। অসম্ভব রোমাঞ্চকর এই যাত্রা। পাহাড়ের আকাবাকা পথ ধরে প্রায় তিন ঘন্টা চলার পর আপনার ঘোড়া আপনাকে পৌঁছে দেবে মিনি ‘সুইজারল্যান্ডে’। যেখানে পার পারসন ৩০ টাকা টিকেট কেটে ঢুকতে হবে। আমরা স্লেজিং করেছিলাম। দুটোতে দিয়েছিলাম ৩০০।
এখানে বিশেষ ভাবে একটি বিষয়ে বলতে চাই যারা বাচ্চা নিয়ে যাবেন তাদের জন্য।
বৈসারণ যাত্রা পুরাটাই পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা নির্ভর করবে আপনার এবং বাচ্চার সাহস ও শক্তির ওপর। আমি যেমন এক বছর বয়সী বাচ্চাকেও তার বাবার সাথে যেতে দেখেছি (ছবি দেখুন)। আবার তিন বছর বাচ্চাকেও দেখেছি শুরুতেই ভয়ে কেঁদেকেটে একশেষ। তাই শুরুতেই সাহস ও শক্তির ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন।
আমার মেয়ে যেমন যাত্রা শুরুর প্রথম দশ মিনিট একটু অস্বস্তিতে ছিল কিন্তু এরপর পুরো পথ তার ঘোড়া সে নিজেই চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আর ঘোড়াগুলো এতই ট্রেনিংপ্রাপ্ত যে কোন ভয়ের কিছু নেই। পাঁচ/ছয় বছর বয়েসের বাচ্চাকে আপনার সাথেই আপনার ঘোড়ায় নিতে পারবেন।
৪. বরফেরও নানা রূপ
শ্রীনগর বাদে কাশ্মীর এখন পুরাটাই বরফে ঘেরা। একটা মজার কথা বলি বিশ্বাস করেন, এই বরফের সৌন্দর্যও একেক জায়গায় একেক রকম। কেউ কেউ বলতে পারেন এত বরফ দেখে কী হবে সবই তো এক! না এক না! পেহেলগামে একরকম, গুলমার্গে একরকম আবার সোর্নমার্গে অন্যরকম। প্রত্যেকটা জায়গার বরফের সৌন্দর্য আলাদা আলাদা।
৫. গুলমার্গ ও গন্ডোলা
গুলমার্গে আপনি শুধু বুট ভাড়া নেবেন ১০০ বা ২০০ নেবে। ওদের কথায় কান দিয়ে জ্যাকেট ভাড়া নেবেন না। কারণ জ্যাকেট লাগবে না। আপনার নিজের যেটা পরা থাকবে ওটাই যথেষ্ট। আর গন্ডোলা যখন যাবেন তখন সূর্য থাকবে মাথার ওপর। তাই আলাদা ওদের জ্যাকেট দরকার হবেনা। হাতমোজা সাথে রাখবেন কারণ বরফ নিয়ে খেললে হাতমোজা লাগবে।
গন্ডোলা রাইডের প্রথম ফেস পার পারসন ৭৪০ রুপি। দ্বিতীয় ফেস ৯৫০। তিন বছরের নিচের বাচ্চার জন্য ফ্রি।
গুলমার্গেও স্লেজিং করা যায়। আর স্কেটিং। আমরা স্লেজিং করেছিলাম। পার স্লেজিং ৭০০ করে পরেছিল।
৬. শ্রীনগর
পেহেলগাম, গুলমার্গ, সোর্নমার্গ ঘুরতে ঘুরতে অনেককেই দেখেছি শ্রীনগরকে কম প্রাধান্য দিতে। কিন্তু শ্রীনগরেও দেখার আছে অনেক কিছু। বরফ দেখার আগে বা পরে একদিন সবুজ ঘেরা প্রকৄতিতে শ্রীনগরে ঘুরে বেড়ান। যেমন ডাল লেকের পাড়ে এক কাপ চা নিয়ে আমি বসে ছিলাম প্রায় দুই ঘণ্টা। আর লেকের সিকারা রাইডে ঘোরার মজা তো আছেই।
বোটানিক্যাল গার্ডেন খুব সুন্দর। এছাড়া আমি গিয়েছিলাম চশেমশাহী গার্ডেন, মুঘল গার্ডেন, নিশাত গার্ডেন। তিনটি গার্ডেনই একই ঘরানার হলেও আমার কাছে খারাপ লাগেনি।
৭. খাওয়া-দাওয়া
সকালের নাশতা ও রাতের খাবার হোটেলে ইনক্লুড করে নেয়া ভাল। কারণ রাতে বাইরে ঠাণ্ডার একটা ব্যাপার আছে আর তাছাড়া সারাদিন ঘুরে রুমে ফেরার পর রাতে আর বাইরে খেতে যেতে ইচ্ছে করবে না। আর সকালে যেহেতু প্রতিদিন বেরিয়ে পরবেন তাই হোটেল থেকে পেট ভরে বুফে নাশতা খেয়ে রওনা দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমি হোটেল ও হাউজবোটে সকালের নাশতা ও রাতের খাবার ইনক্লুড করে নিয়েছিলাম। আমার পরেছিল ৩০০০ রূপি পার নাইট।
৮. প্লেন ফেয়ার
এক/দেড়মাস আগে টিকেট কাটলে খরচটা কমবেশি এরকম হবে
ঢাকা-কলকাতা রাউন্ড ট্রিপ পার পারসন ১০০০০ (এখানে কেউ চাইলে বাসে বা ট্রেনে কলকাতা যেতে পারেন। তাহলে কিছু খরচ কম হবে)।
এরপর কলকাতা থেকে শ্রীনগরের প্লেন। এখানে একটা কথা বলে রাখি সরাসরি শ্রীনগরে ফুল যাত্রী পাওয়া যায়না বলে ইন্ডিয়ার ডোমেস্টিক এয়ারলাইনসগুলো দিল্লি, চন্ডীগড় বা ব্যাংগালোরে ট্রানজিট বা লেওভারে ট্রিপ চালায়।
আমার যাওয়ার এয়ার ছিল স্পাইসজেট। আমি নিয়েছিলাম লেওভার অপশন। দিল্লিতে এক ঘন্টার লেওভার ছিল। আমাকে বিমান পাল্টাতে হয়নি। একইভাবে আসার দিন ছিল ইন্ডিগো। চন্ডীগড়ে ৩০ মিনিটের লেওভার। দুটো মিলিয়ে রাউন্ড ট্রিপের ভাড়া পরেছিল বাংলাদেশী টাকায় পার পারসন ১৯০০০।
এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি ইন্ডিয়ার ডোমেস্টিক এয়ার লাইনসগুলোতে টিকেটের সাথে ফ্রি খাবার দেয়না। আপনাকে আলাদা কিনে খেতে হবে। আর এক্ষেত্রে টিকেট কেনার সময় আলাদাভাবে খাবারটা কিনে নেয়া যায়। তখন ডিসকাউন্ট পাবেন। আর প্লেনে কিনলে ডিসকাউন্ট নাই।
যারা নিজের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টিকেট কাটবেন তারা টিকেটের সাথেই বাজেট অনুযায়ী খাবারটা কিনে রাখুন। এছাড়া শুকনা জাতীয় খাবার আপনি হ্যান্ড ক্যারি করতে পারবেন।
বুকিং প্রসঙ্গ
আমি আমার টুর প্লান নিজেই করেছিলাম। সব টিকেটও আমি ক্রেডিট কার্ডে কিনেছি। প্রথমে কয়েকটা এজেন্সিতে কথা বলেছি কিন্তু ওদের বাজেট আমার পছন্দ হয়নি। আমার হাতে যেহেতু সময় ছিল তাই পরে আমি নিজেই সব বুকিং করেছি। এক্ষেত্রে শুরুতে গুগল করে হোটেল, হাউজ বোট পছন্দ করে পরে ওদের ডিরেক্ট কল করে বুকিং দিয়েছি। আর হোটেল বুক অনলাইন দিলেও ভুলেও হাউজবোট অনলাইন বুক করবেন না। কারণ অনলাইনে বুকিংয়ে হাউজবোটে অনেক বেশি পড়ে।
ডাল লেকে যেদিন সিকারা রাইডে ঘুরেছিলাম সেদিন বার বার আমাদের বুড়িগঙার কথা মনে পরেছিল। কী সুন্দর বুড়িগঙা শুধু ময়লা ফেলে ফেলে আজ এই দশা। সবাই সচেতন হন আর বেড়াতে গিয়ে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। ###